একসময় ইউরোপজুড়ে ভয়াবহ মহামারি সৃষ্টি করেছিল প্লেগ। ইতিহাসে যা ‘ব্ল্যাক ডেথ’ নামে পরিচিত। চতুর্দশ শতকে এই মহামারিতে ইউরোপে পাঁচ কোটির বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) জানিয়েছে।
এবার রাশিয়ায় প্লেগ গবেষণাগারের এক কর্মীর নিউমোনিয়ায় মৃত্যুর ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে রোগটি। সাইবেরিয়ার ইরকুটস্ক অ্যান্টি-প্লেগ রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ২৮ বছর বয়সী কর্মী দারিয়া শিপিলোভা গত ২ অক্টোবর মারা যান। তাঁর মৃত্যুর কারণ এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। রুশ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তিনি অজ্ঞাত কারণে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং এখন পর্যন্ত প্লেগে আক্রান্ত হওয়ার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
তবে রাশিয়ার একটি প্লেগ গবেষণাগারে কাজ করা ওই তরুণীর মৃত্যু এবং তাঁকে ঘিরে বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে নিউমোনিক প্লেগের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এমনকি গবেষণাগারে প্লেগের জীবাণু বহনকারী একটি টেস্টটিউব ভেঙে যাওয়ার দাবি নিয়েও বিভিন্ন সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। তবে এই দাবিরও এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি।
ঘটনার পর প্রায় ২০০ জনকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছিল। রুশ কর্তৃপক্ষের হিসাবে, তাদের মধ্যে বিপজ্জনক কোনো রোগজীবাণুর সংক্রমণ পাওয়া যায়নি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অবশ্য রাশিয়ার কাছে ঘটনাটি সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য ও পরীক্ষার ফল চেয়েছে। হু বলেছে, সঠিক তথ্য পাওয়ার পরই পরিস্থিতির ঝুঁকি যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।
প্লেগ ‘ইয়ারসিনিয়া পেস্টিস’ নামের একটি ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ। সাধারণত ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী ও তাদের শরীরে থাকা মাছির মাধ্যমে এটি ছড়ায়। সংক্রমিত প্রাণীর দেহ বা টিস্যুর সংস্পর্শ এবং কিছু ক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তির শ্বাসতন্ত্র থেকে নির্গত কণার মাধ্যমেও মানুষের মধ্যে সংক্রমণ হতে পারে।
প্লেগের প্রধান তিনটি ধরন হলো বিউবনিক, সেপ্টিসেমিক ও নিউমোনিক প্লেগ। বিউবনিক প্লেগ সবচেয়ে বেশি দেখা যায় এবং এতে সাধারণত লসিকাগ্রন্থি ফুলে বুবো তৈরি হয়। সেপ্টিসেমিক প্লেগে সংক্রমণ রক্তে ছড়িয়ে পড়ে। আর নিউমোনিক প্লেগে ফুসফুস আক্রান্ত হয়।
নিউমোনিক প্লেগ সবচেয়ে গুরুতর ধরনগুলোর একটি এবং আক্রান্ত ব্যক্তির শ্বাসতন্ত্রের কণার মাধ্যমে অন্য মানুষের মধ্যে ছড়াতে পারে। হুর তথ্য অনুযায়ী, এ ধরনের প্লেগের উপসর্গ খুব দ্রুত দেখা দিতে পারে। জ্বর, শ্বাসকষ্ট ও কাশির সঙ্গে রক্তমিশ্রিত কফ হতে পারে। চিকিৎসা না হলে রোগটি দ্রুত প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
তবে বর্তমানে প্লেগের কার্যকর চিকিৎসা রয়েছে। দ্রুত রোগ শনাক্ত করে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করা হলে রোগী সুস্থ হয়ে উঠতে পারেন। হু জানিয়েছে, নিউমোনিক প্লেগের ক্ষেত্রে দ্রুত শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; চিকিৎসা না হলে উপসর্গ শুরুর ১৮ থেকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যেও মৃত্যু ঘটতে পারে।
ইতিহাসে ভয়াবহ মহামারি সৃষ্টি করলেও বর্তমানে প্লেগ তুলনামূলক বিরল এবং বিশ্বের কিছু অঞ্চলে এর সংক্রমণ সীমিত আকারে দেখা যায়। ২০১৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিশ্বে রিপোর্ট হওয়া মানবিক প্লেগের অধিকাংশ ঘটনা ঘটেছে কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র ও মাদাগাস্কারে।
রাশিয়ার সাম্প্রতিক ঘটনাটি নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ থাকলেও এখন পর্যন্ত সেখানে নিউমোনিক প্লেগের প্রাদুর্ভাবের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে গবেষকের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে আতঙ্ক ছড়ানোর আগে পরীক্ষার ফল ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক তথ্যের অপেক্ষা করাই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক